নারী নির্যাতন ও তার প্রতিকার

0
2202
কাজী সিকান্দার

নারী নির্যাতনের ইতিহাস পুরানো। সভ্য যুগের আগে কোন কোন দেশে নারীকে মানুষ হিসেবেই গণ্য করা হত না। এরপর মানুষ হিসেবে স্বীকৃতি পেল, তবে বিভিন্ন অভিধায় অভিযুক্ত করা হল নারীকে। বিভিন্ন দোষে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে নারীকে। এমন শত যুগ পেরিয়ে বর্তমানের আধুনিক যুগে আমরা উপণীত। নারী নির্যাতনের ধরণ ও প্রকৃতি যুগ হিসেবে ভিন্ন ভিন্ন ছিল। গ্রিকদের যুগে নারী এক নিকৃষ্ট জীব বৈ আর কিছুই ছিল না। রোমানদের যুগে পুরুষ নারীকে হত্যা করারও একক অধিকারী ছিল। পরে তারা নারীকে এতটাই অধিকার দিয়েছে যে, জুলিন (৩৪০-৪২০ খ্রি.) বলেন- এক মেয়ে ৫ বছরে দশজন স্বামী বদলায়। হিতে বিপরীত কথার মত। সিনেট জরুস (৩৪০-৪২০ খ্রি.) বলেন- এক নারী ৩০টি বিয়ে করে এবং যে পুরুষকে ত্রিশ নাম্বারে বিয়ে করে সে পুরুষের ২১ নাম্বার বিয়ে ছিল। নারীকে নিয়ে প্রত্যেক যুগে ছাড়াছাড়ি বা বাড়াবাড়ি হয়েছে এখনো হচ্ছে।

প্রশ্ন হতে পারে এত কিছুর পরও কেন নারী নির্যাতন? কেন নারী নির্যাতন দিন দিন বেড়েই চলছে। কেন ধর্ষণের মত এত নিকৃষ্টতার পরিচর্চা হচ্ছে? এ প্রশ্ন এখন সবার।

সামগ্রিকভাবে বিগত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে ৩ হাজার ৫৮৭ জন নারী ধর্ষণের শিকার। এর মধ্যে ২৭৮ জন ধর্ষণের পর হত্যার শিকার হয়েছে। এ ধর্ষণ ও হত্যার মধ্যে ৮৬ শতাংশই শিশু ও কিশোর। এরপর আগুনে, এসিডে, ও বিভিন্ন নির্যাতনতো আছেই।

বর্তমানে বাংলাদেশে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে তা লোমহর্ষক, মেনে নেয়া যায় না। আমাদেরকে ভাবিয়ে তোলে। পুরো জাতিকে লজ্জিত করে। গত ডিসেম্বরে নোয়াখালীর সুবর্ণচরে সন্তানের সামনে মাকে গণধর্ষণ। টাঙ্গাইলে সখীপুরে খেলার মাঠ থেকে তরুন-তরুণীকে তুলে নিয়ে পাঁচজনে ধর্ষণ করে তা ক্যামেরায় ধারণ করে প্রকাশ করা। ৩ বছরের মেয়ের যৌনাঙ্গ ব্লেট দিয়ে কেটে ধর্ষণ করে হত্যা করা হয় এ দেশে। এর চেয়ে রক্ত হিমকরা ঘটনা আর কি হতে পারে? নরসিংদীতে মা-মেয়েকে এক সাথে ধর্ষণ। এ ঘটনাগুলো অতি সাম্প্রতিক। মনে হয় এখন নারী নির্যাতনের যুগ চলছে। তনু, মিতু, খাদিজা সহ আরো কত ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি ফেনীর নুসরাতকে অগুন দিয়ে হত্যা। কত মানুষ চোখের জল ফেলেছে। এখন সর্বত্র মিছিল, প্রতিবাদ চলছে হত্যাকারীর উপযুক্ত বিচারের জন্য। হয়ত সামনে আরেকটি এমনি শিহরিত ঘটনা ঘটবে আমরা এ নুসরাতকে ভুলে অন্য তনু, মিতুর জন্য রাস্তায় নামব। মিছিল মিটিং করব। প্রতিবাদ করব। এরপর হয়ত আরো কোন খাদিজা, নুসরাতের জন্য।

এখন প্রশ্ন এমন আন্দোলন, প্রতিবাদ আর কত করতে হবে? এর কোন সমাধান কি রাষ্ট্র দিতে পারে না? আইন বা দেশের জনগণ কি কোন পন্থা বের করতে পরে না? এ দেশে আইন আছে, মামলাও হচ্ছে। গত পাঁচ বছরে পুলিশ সদর দফতরের হিসাবে ১৯ হাজারেরও বেশি মামলা হয়েছে। প্রতিদিন গড়ে ১১টি মামলা হচ্ছে।

এ মামলা হওয়ার পরও কোন কাজ হচ্ছে না। যেন এখন মানুষ মামলাকে ভয় পাচ্ছে না। নারীর পক্ষে দেশে আইন আছে, মামলা আছে, ধর্ম আছে, আন্দোলন আছে, বিভিন্ন সংগঠন আছে, নারী ও পুরুষরাও চায় নির্যাতন না হোক। তবুও নারী নির্যাতন হচ্ছে, আরো দিন দিন বাড়ছে। কেন?

এ প্রশ্নের উত্তরে প্রথমত- আইন আছে প্রয়োগ নেই: স্পষ্ট করে বলা যায়, দেশে নারীর পক্ষে আইন আছে সত্য তবে প্রয়োগ নেই বললেই চলে এবং আইনের অনেক ফাঁক-ফোকর রয়েছে সেই ফাঁক-ফোকর ব্যবহার করে বেরিয়ে যাচ্ছে দোষীরা। আইন আছে তবে সে আইন ক্ষমতার দাপটে টিকে থাকতে পারছে না। সে সুযোগে পার পেয়ে যাচ্ছে অপরাধীরা, আর যখন আপরাধী ঠিক নিজের অবস্থানেই আছে তখন অন্য অপরাধী তা দেখে তার অপরাধ করার প্রবণতা বাড়ছে আর যে অপরাধী বেঁচে গেছে সে দুর্ধর্ষ হয়ে আরো বড় অপরাধের মাস্টারপ্ল্যান করছে।

দ্বিতীয়ত মামলা আছে সাজা নেই। আইন হিসেবে মামলাও হচ্ছে তবে মামলার নিষ্পত্তি ও সাজা হচ্ছে না। ২০০২ থেকে ২০১৬ পর্যন্ত ধর্ষণ সংক্রান্ত মামলার সাজা মাত্র ৩ শতাংশেরও কম। এটি ঢাকা জেলার পাঁচটি নারী নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনালের হিসাব।

১৯৯৮ সালে জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ে জসিম উদ্দিন মানিক নামে এক দলীয় ক্যাডার প্রতিদিন রাতে বাসর সাজিয়ে ধর্ষণ করত, যখন ১০০টি ধর্ষণ পূর্ণ করল তখন সে মিষ্টি বিতরণ করে। তার দৃষ্টান্তমূলক সাজা জনগণ দেখেনি। সিলেটের বদরুল খাদিজাকে কুপিয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছে তারও কোন শাস্তি জাতি দেখেনি। ২০১৮ সালে বরিশাল বানারীপাড়ায় মা মেয়েকে ধর্ষণের পর মাথা ন্যাড়া, তুফান, দলীয় শক্তিতে সেও নিরাপদে আছে। তনু, কমিল্লা ক্যান্টনমেন্ট, এটিতো সুরক্ষিত এলাকা তবুও ঘটনা ঘটলো, এখন পর্যন্ত কোন কিছুই হল না। ৩১ ডিসেম্বর ২০১৮ নোয়াখালী সুবর্ণচর, সন্তানের সামনে ধর্ষণ করল রুহুল আমীন। তখনো মিছিল মিটিং হয়েছে তবে কাজ কিছুই হল না। এভাবে আরো কত হত্যা, কত নির্যাতন, কত ধর্ষণ নিরবে হচ্ছে কিন্তু কোন সাজ পাচ্ছে না দোষীরা। এ সাজা না হওয়াতে দিন দিন অপরাধ বাড়ছে।

তৃতীয়ত আন্দোলন আছে কার্যকারিতা নেই, সদিচ্ছা নেই। ‘সর্ষের মধ্যে ভুত’ বলে একটি প্রবাদ কথা আছে। বাংলাদেশে নারী অধিকার আদায়ের জন্য যে আন্দোলন হচ্ছে যেখানে বেলা শেষে দেখা যায় সেখানেই নারী নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। যে ধরনের লোক আন্দোলন করছে সেই একই ধরনের লোকের হাতেই নির্যাতন হত্যা বা ধর্ষণ বেশি হচ্ছে। যার কিছু চিত্র উপরে দেখানো হয়েছে। তবে নারী কিভাবে মুক্তি পাবে?

সভ্যতা, শিক্ষা, সংস্কৃতি যেখানে উৎকর্ষতা সাধিত হয়। চরিত্র গঠন সমাজ বিনির্মাণের সূতিকাগার যে শিক্ষাঙ্গণ, বড় আফসোসের বিষয় আজ সেখানেই তা ধ্বংস হচ্ছে। যাদের হাতে সভ্যতার ইতিহাস রচিত হওয়ার কথা। যারা সত্য সুন্দরের লালনকারী হওয়ার কথা বড় নির্মমতা সেই শিক্ষিতজনের হাতে আজ সভ্যতা ধ্বংসের পথে। যাদেরকে কেন্দ্র করে একটি দেশ ও সমাজ ভবিষ্যত আশা ও স্বপ্ন দেখে। সেই শিক্ষার্থীরা আজ আশাহীনতার অতলে হারিয়ে যাচ্ছে। তাদের চারদিকে তারা অন্ধকার রচনা করছে।

চতুর্থত ধর্ম আছে মান্যতা নেই। ইসলাম পুরুষকে বলে, কোন মেয়েকে ধর্ষণ করা তো দূরে থাক, অন্য মেয়ের দিকে তাকানোই যাবে না। এক সাথে পর্দাহীনভাবে চলা যাবে না। দেখা করা যাবে না। এমনকি প্রয়োজন ছাড়া কথা বলাও যাবে না।

ইসলাম নারীকে বলে, তোমাকে কেমন করে ধর্ষণ করবে তুমি তোমার সৌন্দর্য ওই লোভাতুর কামুক বা ধর্ষকের সামনে দেখাবে না। তুমি তোমাকে ডেকে রাখবে নিরাপদে। এরপরই যদি কেউ অপকর্ম, যিনা ও ধর্ষণ ইত্যাদি করে। আর সে যদি বিবাহিত হয় তবে তাকে জনসম্মুখে পাথর মেরে হত্যা করা হবে, অবিবাহিত হলে তাকে চাবুক মারা হবে। দেখবে তখন আর এমন গর্হিত কাজ থাকবে না।

ইসলাম এখানে পর্দার বিধান দিয়ে প্রথমে দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনের সবক দিয়েছে। প্রথমে তাদের দূরত্বে থেকে, অপকর্ম হওয়ার সম্ভাবনাই শেষ করে দিয়েছে। এরপরও যদি অপকর্ম হয়ে যায় তখন তাকে একেবারে দাফন করার শিক্ষা দিয়েছে, যাতে এ শাস্তি দেখে অন্য কারো ভেতর এমন অপকর্মের কথা জাগ্রত না হয়।

ধর্ম আছে, আছে ধর্মের এমন শিক্ষা তবে মান্যতা নেই। অপরাধ হওয়ার সম্ভাবনার দিক যদি বন্ধ হয়ে যায় তবে কিভাবে অপরাধ হবে? এখন যদি বলা হয় এর জন্য নারী পুরুষকে পর্দার বিধান পালন করা প্রয়োজন, তখন কথা উঠবে নারীকে বন্দী করা হচ্ছে। যদি বলা হয় এদেরকে জনসম্মুখে হত্যা করা হোক, তখন বলবে এতো নির্মমতার কাজ এটি হয় না, এ আধুনিক যুগে হবে না। কিন্তু একজন ধর্ষক যে, ৩ বছরের একটি মেয়েকে ব্লেট দিয়ে তার যৌনাঙ্গ কেটে ধর্ষণ করে হত্যা করেছে? নুসরাতের মত নিরাপরাধ মেয়েকে আগুনে পুড়তে হয়েছে? মিতু, নিতুরা যে হত্যা হচ্ছে? এদের কথা কে চিন্তা করবে? কিভাবেই বা এরা রক্ষা পাবে?

যদি আমরা ভবিষ্যতে আমাদের প্রজন্মকে রক্ষা করতে চাই তবে আমাদেরকে কিছু না কিছু এখনই করতে হবে। সমষ্টিগতভাবে আমাদের কিছ কাজ করতে হবে। এক. দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। দুই. পুরুষকে পুরুষের স্থানে নারীকে নারীর স্থানে রাখতে হবে। তিন. তাদের প্রত্যেকের অধিকার রক্ষা করতে হবে। চার. নারী-পুরুষকে ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলতে হবে। পাঁচ. আইনের যথাযথ প্রয়োগ করতে হবে। ছয়. আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে নিজ বা পর ভাবা যাবে না।

পরিশেষে একটি কথা বলব, একটি অনুরোধ করব একবার, একবার শুধু এ ক্ষেত্রে ধর্মীয় বিধান পালন করে দেখুন না? কোন ফল দেখা যায় কি না?

সম্পাদক : মাসিক কলম
আশরাফাবাদ, ঢাকা-১২১১

LEAVE A REPLY