নাস্তিক্যবাদ অক্ষম মানুষের তৈরি ব্যর্থ মতবাদ

0
1813

মাওলানা উবায়দুর রহমান খান নদভী

আল্লাহ তাআলার প্রাকৃতিক নিয়ম নিঃসন্দেহে খুবই বিজ্ঞানসম্মত কৌশলপূর্ণ। সৃষ্টিজগৎ পরিচালনা ও নিয়ন্ত্রণে আল্লাহ রাব্বুল আলামীন নীতিমালা বা রীতিপদ্ধতি প্রণয়ন করেছেন, আল্লাহর হুকুম ছাড়া তার কোনো ব্যত্যয় হয় না। যেমন দুনিয়াকে তিনি দারুল আসবাব হিসাবে সৃষ্টি করেছেন। তাই ইহকালে কোনো নিয়মনীতি, বিজ্ঞান, মাধ্যম ও কারণ ছাড়া কোনো কিছু সঙ্ঘটিত হয় না। হওয়া সম্ভব নয় এমন নয়, তবে হয় না। এরপরও মানুষ যেন রীতি, নীতি, পদ্ধতি, বিজ্ঞান, মাধ্যম ও কারণকেই স্বয়ংসম্পূর্ণ মনে করে না বসে এবং প্রকৃতিকে যে প্রতি মুহূর্তে আল্লাহ নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন এ কথাটি ভুলে না যায়, সে জন্য মানুষের ইতিহাসে মহান আল্লাহ তাআলা অনেকগুলো কুদরত এমন প্রদর্শন করেছেন, যা তাঁর নিরঙ্কুশ ইচ্ছা ও ক্ষমতাকে সুদৃঢ়ভাবে প্রমাণ করেছে। সূর্যের ন্যায় স্পষ্ট করে দিয়েছে, যে নীতি, পদ্ধতি ও প্রকৃতি আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তা অনুসরণে তিনি নিজে বাধ্য নন। তবে মহাসৃষ্টিকে তার নির্ধারিত সময়কাল পর্যন্ত ধারণাতীর সুচারুরূপে পরিচালিত করার জন্য তিনি তাঁর সুন্নাত বা রীতিপদ্ধতি বেধে দিয়েছেন ।
যেমন পিতা-মাতার মতো উৎস ছাড়া হযরত আদমকে সৃষ্টি। আবার পিতা মাতা ছাড়া কিন্তু আদমের দেহের কোষ থেকে হযরত হাওয়াকে সৃষ্টি। সমস্ত জনপদকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস করেছেন কিন্তু হযরত নুহ (আ.) ও তার নৌযানের মানুষ ও প্রাণীগুলোকে রক্ষা করেছেন। আগুনের চিরাচরিত দহনশক্তি কেবল হযরত ইবরাহীম (আ.)-এর জন্য রহিত করে সেদিনকার জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডকে তার জন্য শান্তি ও শীতলতার বিছানায় পরিণত করেছিলেন। নবী-রাসূল ও তাঁর অনেক মনোনীত নেক বান্দাদের জীবনে সর্বশক্তিমান আল্লাহ অনেক অস্বাভাবিক ঘটনা ঘটিয়েছেন, যা দুনিয়াতে প্রচলিত তাঁর রীতিপদ্ধতির বাইরে। তালাশ করে উদাহরণ পেশ করলে এমন অনেক ঘটনা পাওয়া যাবে। বলতে গেলে নবীগণের সমস্ত মুজেযা ও সালেহীনের সব কারামত এরই অন্তর্ভুক্ত।
সদ্যজাত শিশুর মুখে বুলি ফোটানো যেমন হযরত ঈসা (আ.) তাঁর মায়ের পবিত্রতার বিষয়ে সম্প্রদায়ের লোকদের আশ্বস্ত করেছিলেন। যেমন মিসরে শাসকের প্রাসাদে দুগ্ধপোষ্য কোলের শিশু হযরত ইউসুফ (আ.)-এর নিষ্কুলুষ চরিত্রের কথা অপূর্ব এক যুক্তির মাধ্যমে ঘোষণা করেছিল। সেখানে শিশুটির বাকশক্তি শুধু নয়, তার যুক্তি ও বুদ্ধির অতুলনীয় ব্যবহারও সর্বশক্তিমান আল্লাহর স্বপ্রচলিত ও স্বনির্ধারিত রীতি-পদ্ধতির ব্যতিক্রম, যা তিনি তাঁর সর্বময় ক্ষমতার নিদর্শন হিসাবে মানুষের সামনে পেশ করেছেন, যাতে মানুষ স্বাভাবিক নিয়ম বা প্রকৃতির রীতিকে অবধারিত ও স্বয়ংক্রিয় মনে না করে বসে।
যে বড় দাগের ভুলটি ন্যাচারালিস্ট নামের নাস্তিক সম্প্রদায় করে থাকে। বাংলায় যাদের প্রকৃতিবাদী বলা যেতে পারে। তারা অজ্ঞতাবশত ধরে নিয়ে থাকে যে জীবন জগতের কোনো স্রষ্টা নেই। এর খবর রাখার, পরিচালনা করার, নিয়ন্ত্রণ করার বা শেষ পর্যন্ত এর সমাপ্তি এবং পরিণতি ঘটানোর মতো কেউ নেই। প্রকৃতি নিজেই তার নিয়মে সৃজন, বিকাশ ও ধ্বংস করে যাচ্ছে। এ মতবাদটি অবাস্তব ও অজ্ঞতাজনিত দুর্বলতার কারণে জন্ম নিয়েছে। যার অনুসারীরা বলে Ñ
আমাদের এ জীবন, জন্ম লাভ ও মৃত্যু ছাড়া আর কী। চলে আসা নিয়মেই আমাদের জন্ম, নির্দিষ্ট সময়ে এখানে থাকা ও প্রকৃতির নিয়মেই চলে যাওয়া। মাঝে কিছু সময়ের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, প্রাপ্তি ও বঞ্চনামাত্র।
আর যারা সৃষ্টিকর্তার ওপর ঈমান রাখে তারা নিজের সীমিত চিন্তাশক্তি কিংবা দুর্বল দৃষ্টিশক্তির ওপর নয়; বরং তারা নির্ভর করে সর্বশক্তিমানের বাণীর ওপর। তাঁর দেয়া বার্তা, নির্দেশনা ও জ্ঞানের ওপর, যা তিনি পৃথিবীর বাসিন্দা ও মানবকূলের মনোনীত নবী-রাসূল শ্রেণীর কাছে প্রেরণ করেন। ঈমানদাররা আল্লাহর কালামের মধ্যেই আল্লাহর বিস্তারিত পরিচয় পেয়ে থাকেন। আল্লাহ নিজেকে মানুষের চিন্তা ও উপলব্ধির ঊর্ধ্বে এমন এক সত্ত্বারূপে পরিচিত করেছেন, যিনি আকাশ ও যমীনের তথা গোটা সৃষ্টিজগতের নুর বা জ্যোতি। যার সম্ভাব্য বর্ণনা পবিত্র কুরআনে এভাবে এসেছেÑ ‘আল্লাহ হলেন যমীন ও আকাশমণ্ডলীর নুর বা জ্যোতি। তার নুরের এই যেন একটি শামাদান বা দীপাধার। তাতে একটি প্রদীপ। রয়েছে একটি কাঁচাবরণের মাঝে। কাঁচটি যেন একটি মণি-মাণিক্যের দর যা প্রজ্বলিত আছে একটি মহান জ্বালানী-বৃক্ষ যয়তুনের উৎস থেকে। পূর্ব বা পশ্চিম কিংবা কোনো দিকের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বৃক্ষের তেলে নিজ থেকেই প্রদীপ হয়ে জ্বলে উঠছে, যদিও আগুন তাকে স্পর্শ করেনি। আলোয় আলোয় ভরা আলোকময় অস্তিত্ব। আল্লাহ যাকে ইচ্ছা আলোর পথ দেখান। তার জ্যোতির পাণে টেনে নেন। আর আল্লাহ মানুষের জন্য উদাহরণ পেশ করে থাকেন। বস্তুত আল্লাহ প্রতিটি বিষয়ে পরম জ্ঞানী। (সূরা নুর : আয়াত ৩৫)
আল্লাহ নুর হিসাবে, পরম শক্তির আধার হিসাবে, সৃষ্টিজগতের স্রষ্টা, নিবন্ধ ও বিধাতা হিসাবে এক, একক ও অদ্বিতীয়। যাকে ধারণা বা কল্পনা করা যায় না। যাঁকে ক্ষুদ্র ও দুর্বল মানুষ অনুভব বা উপলব্ধিও করতে পারে না। মানবিক অক্ষমতায় সে কেবল আল্লাহর নিজ প্রদত্ত পরিচয়টুকু লাভ করতে সক্ষম। আল্লাহকে সে স্মরণ করতে পারে। তাকে ভালোবাসতে পারে। তাকে না করতে পারে। তাঁর সাথে মন, মেধা ও অস্তিত্বের সবটুকু দিয়ে সম্পর্ক গড়ে তুলতে পারে। নিবেদনের দীপ জ্বেলে আল্লাহর সকাশে নিজের সবটুকু হারে। নিংড়ে উপস্থাপন করতে পারে। নিজের দুঃখ, কষ্ট, যাতনা, অভাব, অভিযোগ প্রার্থনা নিঃশেষে প্রকাশ করতে পারে।
ঈমানদাররা জানে যে আল্লাহ তার কুদরতের দ্বারা সার্বক্ষণিকভাবে সৃষ্টিজগতকে নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা করছেন। তিনি তার কোনো ক্ষুদ্রাতি সৃষ্টি সম্পর্কেও বেখবর নন। তিনি তাঁর অসংখ্য গুণাবলীর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ইলম ও খবর এ দুয়ের দ্বারা সদা সর্বত্র সংঘটিত সব বিষয়ের স্থিতি ও সম্পর্কে পূর্ণতর অবহিত। এটা যে কত ব্যাপক ও গভীর হতে পারে। ধারণা বা কল্পনা করা খুবই কঠিন। আল্লাহর মনোনীত নবী-রাসূল মারেফাত বা পরিচয়ের বিশেষ নেয়ামতপ্রাপ্ত সালেহ বান্দারা তাঁর নিরঙ্কুশ কুদরতের ব্যাপ্তি, শক্তি ও গভীরতা সম্পর্কে বেশ ভালো জানেন।
সক্ষমতা, পবিত্রতা, করুণা ও ঔদার্য্য, ক্ষমা, ক্রোধ, পছন্দ, ইত্যাদি সম্পর্কে মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন মাজীদে এবং তাঁর রাসূল হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যবানীতে যা প্রকাশ করেছেন তা মানুষের জন্য যথেষ্ট। নিজের অতীত ও ভবিষ্যৎ (জন্ম-মৃত্যুর উদ্দেশ্য সম্পর্কে, একটি জীবনযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্য ও সম্পর্কে, নিজ আত্মার শুরু ও এর অনন্ত যাত্রার দীর্ঘ পথ ও গন্তব্য নিজ সৃষ্টি ও ধ্বংস সম্পর্কে, একটি মানবজনম লাভ ও এর পরিণতির সম্পর্কে মানুষ সঠিক কোনো জ্ঞান কখনোই লাভ করতে পারত না মহান আল্লাহ নবী-রাসূলের মাধ্যমে তাঁর বাণী ও জ্ঞান পাঠাতেন।
এসব বিষয়সহ মানবজীবনের আরও অজানা প্রসঙ্গ নিয়ে মানুষ। যাদের সীমিত জ্ঞান, ভাবনা, অনুভূতি, আবেগ, ধারণা ও কল্পনা মিশিয়ে যে সন্ধানটুকু করেছে এর নাম দর্শন। ইহজীবনের নানা অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার থেকে বা মানুষের চিন্তা, জ্ঞান ও অনুভূতির ভিত্তিতে ইহজীবন সম্পর্কিত কিছু দর্শন সত্যের দিশারী হতে পেরেছে। তবে মানুষের জন্মের আগের এবং মৃত্যুর পরের বিষয়ে দর্শনের সব কথাই অন্ধকারে ঢিল ছোড়ার চেয়ে বেশি কিছু নয়। মানবজনম পরিচালনা ও এর সার্থকতা সম্পর্কে দর্শনের সব প্রস্তাবনা ও নির্দেশনা ভ্রান্তিতে ভরপুর।
এ জায়গাটি পূরণ করার জন্য, মানবজনমের শত জিজ্ঞাসার জবাব প্রদানের জন্য, মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ পরিণতি সম্পর্কে নিখুঁত জ্ঞান বিতরণের জন্য সর্বশক্তিমান আল্লাহ ফেরেশতার মাধ্যমে মনোনীত নবী-রাসূলদের নিকট নিজের জ্ঞান, নির্দেশনা ও আলো প্রেরণ করেছেন ওহীর মাধ্যমে। এ দীনি প্রত্যাদেশ মানুষকে যে দার্শনিক ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছে, এরপর আর এসব বিষয়ে তার মানুষের দেয়া কোনো দর্শনের প্রয়োজন থাকে না।
ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ তার অপার করুণায় হেদায়েতের সূর্য ও চন্দ্ররূপে, উজ্জ্বল প্রদীপরূপে পবিত্র কুরআন দিয়ে বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত হযরত রাসূলে কারীম (সা.)কে দুনিয়াতে প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ অবিশ্বাসী, প্রকৃতিবাদী, সংশয়বাদী, যুক্তিবাদী, নানা পর্যায়ের নাস্তিক ও ধর্মহীনদের প্রতি মহাসত্যের দাওয়াত দিয়েছেন। যারা আল্লাহর অস্তিত্বে বিশ^াসী তবে তার মান অনুযায়ী নিষ্কলুষ বিশ্বাসী নয়। নিজেদের মানবিক বিশ্বাসী ক্ষুদ্রতা, জড়তা, মূঢ়তা, অস্বচ্ছতা, ত্রুটি ও দুর্বলতায় ভরা বিশ্বাস ও ধারণা নিয়ে তাদের কল্পনার খোদায় বিশ্বাসী। তাদের ধারণার খোদায় বিশ্বাসী তারা আল্লাহর সাথে নানাভাবে অন্যকে শরীক করে। এদের ব্যর্থ জীবন ও চেষ্টা-সাধনার বিষয়েও আল্লাহ তাআলা স্পষ্ট ব্যাখ্যা দিয়েছেন।
মোটকথা ঈমানদারদের জন্য আল্লাহ যেমন হাজারো আলোকমালা সাজিয়ে রেখেছেন পাশাপাশি যারা আল্লাহর সঠিক পরিচয় পায়নি, তাঁকে এবং রাসূলকে বিশ্বাস করেনি, তাঁর সব নবী-রাসূল, তার ফেরেশতাকূল, আসমানী কিতাব, পরকাল, ভাগ্যের ভালো ও মন্দ দুটোই আল্লাহ থেকে হয় এবং মৃত্যুর পর হিসাব-নিকাশ, বিচার ও চূড়ান্ত পরিণতির জন্য মানুষের পুনরুত্থানে বিশ্বাসী নয়। এর পাশাপাশি বিশ্বাস করার মতো জরুরি আরও কিছু বিষয় এবং মানবজীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহ ও রাসূলের বিধি-বিধান, শরীয়তের দিকনির্দেশ যারা মেনে নিতে সম্মত হয়নি তাদের জন্যও পরম করুণাময় আল্লাহর শত সহস্র দেদীপ্যমান পথনির্দেশ ও আলোকজ্জ্বল হেদায়েত এই পৃথিবীতে বিরাজমান ।
মহান আল্লাহ একটি প্রকৃতিগত ও স্বভাবগত মহাসত্যকে প্রচারের ওপরই বেশি জোর দিয়েছেন । কারণ ভর দুপুরে সূর্যের অস্তিত্ব কেউ অস্বীকার করবে আর এ জন্য তাকে যুক্তি-প্রমাণ দিয়ে বোঝাতে হবেÑ এ বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে কেউ আশা করে না।
তৃষ্ণার্ত মানুষকে শীতল মিষ্টি পানি এগিয়ে দেয়া প্রকৃতি ও স্বভাবের মধ্যে পড়ে। সুপেয় পানির পাশাপাশি তাকে যে এর স্বপক্ষে অনেক যুক্তিতর্ক ও তথ্য-প্রমাণও দিতে হবেÑ স্বাভাবিক অবস্থায় কোনো মানুষ এমন চিন্তা করবে না। স্বাভাবিক চিন্তা বা দীনে ফিতরাত থেকে গুটিকয় লোক চোখ ফিরিয়ে নিতে পারে ভেবে পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহয় তুলনামূলক অল্প কিছু জায়গাতেই নাস্তিক, মুরতাদ, অবিশ্বাসী বা ভ্রান্ত বিশ্বাসে নিমজ্জিত লোকদের উদ্দেশ্যে ওয়াজ ও উপদেশ দেয়া হয়েছে। যারা আল্লাহর সাথে শরীক করে কিংবা মুখে ঈমান আনলেও অন্তরে ঈমান আনেনি, এ ধরনের লোকেদের জন্য আল্লাহ ও রাসূল বেশ অনেক দাওয়াত, যুক্তি, প্রশ্ন ইত্যাদিসহ সঠিক চিন্তা-ভাবনার মাধ্যমে। ঈমান আসল সত্যকে গ্রহণ করার নসিহত করেছেন। কুরআন ও হাদীস এ ধরনে ওয়াজ ও নসিহতে ভরপুর।

LEAVE A REPLY