দেশজুড়ে নেশার মরণ থাবা : প্রয়োজন ধর্মীয় নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ

0
635
ড. আ ফ ম খালিদ হোসেন

সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে মাদক ব্যবসায়ী ও মাদক চোরাচালানীদের স্বর্গরাজ্যে। ১২টি চক্র মিয়ানমার থেকে টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা পাচার করে। ভোক্তাদের ব্যাপক চাহিদার কারণে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে মাদকের বিরাট মার্কেট গড়ে উঠেছে। কেবল কক্সবাজার জেলায় মাদকাসক্তের সংখ্যা প্রায় ২০ হাজার। এর মধ্যে অন্তত চার হাজার ‘ইয়াবা’ আসক্ত। এক বছরে গোটা বাংলাদেশে বিভিন্ন ব্রাণ্ডের মাদক বেচাকেনা হয় প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকার। বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক মাদক চোরাকারবারীদের নিরাপদ ট্রানজিট রুট। গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল থেকে আনা কোটি কোটি টাকার মাদক টেকনাফ থেকে ঢাকা বিমানবন্দর পর্যন্ত নিরাপত্তারক্ষীদের চোখ ফাঁকি দিয়ে অথবা দুর্নীতিগ্রস্ত কোন কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে ইউরোপ বা দূরপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে বাজারজাত হয় নিয়মিত। মাঝে মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে যা ধরা পড়ে তা শতভাগের একভাগ মাত্র। মাদক বহনকারী হয়তো গ্রেফতার হয়, কিন্তু আসল নায়ক থেকে যায় পর্দার অন্তরালে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হিরোইনের চেয়ে ইয়াবার ক্ষতি বহুগুণ বেশি। মিথাইল অ্যাসকিটামিন বা মেথামফিটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে ইয়াবা তৈরি হয়। এটা শক্তিশালী নেশা সৃষ্টিকারী এবং মস্তিষ্কের জন্য উত্তেজক। মস্তিষ্ক শরীরের চালিকাশক্তি হওয়ার কারণে অতি উত্তেজনা বা বেশি রক্ত চলাচল, সুষ্ঠু চিন্তাধারাকে বিঘ্নিত করে এবং স্মৃতিবিভ্রম ঘটায়। ইয়াবা যৌন উত্তেজনা বৃদ্ধি করে বলে সামাজিক নৈরাজ্য ও অপরাধের জন্ম দেয়। চুরি, ডাকাতি, অপহরণ ও খুন-খারাবীর অনুসঙ্গ হচ্ছে মাদক। ইয়াবা সেবনের ফলে সাময়িক শারীরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পেলেও হ্রাস পেতে থাকে জীবনীশক্তি; আক্রান্ত হয় যকৃত, কিডনী, ও মস্তিষ্কের স্নায়ুন্ত্র (Nervous System)।

মানবদেহে ইয়াবা দীর্ঘমেয়াদের উপস্থিতি হৃদযন্ত্রের কার্যকারিতাকে বিনষ্ট করে দেয়। সামাজিক সমস্যার দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবার ও সমাজে মাদকাসক্তির বিরূপ প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিত হয়, যেমন পারিবারিক নিঃসঙ্গতা, শারীরিক ও মানসিক শক্তির অপচয়, নৈতিক অবক্ষয়, কিশোর অপরাধ বৃদ্ধি ইত্যাদি। মাদক এমন এক নেশা যা চেতনা ও বোধশক্তিকে আচ্ছন্ন করে দেয়, নিঃশেষ করে দেয় শারীরিক কর্মক্ষমতা ও চিন্তাশক্তি। মাদক ব্যবহারের ফলে সাময়িকভাবে দেহের কিছুটা উপকার সাধিত হলেও এর পরিণতি মারাত্মক। মাদকের প্রতিক্রিয়ায় দেহে নানা দুরারোগ্য ব্যাধির জন্ম হয়।

আগে থেকে বাংলাদেশের সমাজজীবনে গাঁজা, আফিম, ভাঙ, তাড়ি, বাংলা মদ ও ফেনসিডিল আসন গড়ে নিয়েছে। সাম্প্রতিককালে এর সঙ্গে সংযুক্ত হয়েছে ইয়াবা, আইস, পিল, কোকেন, হিরোইন, মারিজুয়ানা। বাংলা মদ, গাঁজা, আফিমের গ্রাহক ছিল মূলত সমাজের নিম্ন ও নিন্মমধ্যবিত্ত পরিবারের বখাটে, উচ্ছৃঙ্খল, বেকার ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠী। ‘ইয়াবা’ ও আইস পিল সেবীরা হল সমাজের প্রাচুর্য ও অতিবিত্তের মালিকদের উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েরা। এসব শিক্ষার্থীর জীবনধারায় পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাব বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ধর্মবিবর্জিত শিক্ষা ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতির অন্ধানুকরণই এ দেশের উঁচুতলার সম্ভাবনাময়ী শিক্ষার্থীদের মাদকাসক্তির অন্যতম কারণ। কথাসাহিত্যিক হাসনাত আবদুল হাইয়ের পর্যবেক্ষণ প্রণিধানযোগ্য। ‘নতুন প্রজন্মের তরুণ-তরুণীরা প্রচলিত জীবনযাপনের বিরুদ্ধে দ্রোহ যখন কাউন্টার কালচার তৈরি করেছে, তখন মাদক সেবন সেই ব্যতিক্রমী জীবনযাপনের একটি অনুসঙ্গ হয়েছে।’ ব্যক্তিজীবনে নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ জাগ্রত করার উদ্দেশ্যে সাধারণ শিক্ষা ও বিশেষায়িত শিক্ষা (চিকিৎসা, প্রকৌশল, প্রযুক্তি ও ব্যবসায়) ধারার বিভিন্ন পর্যায়ের পাঠ্যক্রমে ধর্মীয় বিষয় অন্তর্ভূক্ত থাকা কেবল বাঞ্ছনীয় নয়, বরং সময়ের অপরিহার্য দাবি। মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান নির্বিশেষে প্রতিটি শিক্ষার্থীর অধিকার রয়েছে তার নিজের ধর্ম, কৃষ্টি ও উত্তরাধিকার ঐতিহ্য সম্পর্কে জানার। ধর্মীয় মূল্যবোধ শিক্ষার অধিকার থেকে তাদের বঞ্চিত করলে মাদকের ছোবলে নব প্রজন্ম অন্ধকার জগতে হারিয়ে যাবে। উদভ্রান্তি অশুভ উপসর্গ এরই মধ্যে সমাজদেহে দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। মাদকের নেশায় একবার আসক্ত হয়ে গেলে কোন মানুষকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা বেশ কঠিন। মাদক সরবরাহকারী চক্র এতটাই শক্তিশালী যে, জড়িত ব্যক্তিবর্গ তাদের খপ্পর থেকে বেরিয়ে আসা প্রায় অসম্ভব। তাই আগে থেকে প্রতিরোধক ও সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেয়া একান্ত দরকার।

এখানে সঙ্গত কারণে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বাংলাদেশে প্রচলিত মাদরাসা শিক্ষা ধর্মনির্ভর হওয়ার কারণে শিক্ষার্থীদের নৈতিক চরিত্রের মান অতি উচ্চ। গোটা বাংলাদেশে কওমী ও আলিয়া মাদরাসা ক্যাম্পাসে একজনও মাদকসেবীর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যায় না। মহান আল্লাহর দরবারে পরকালীন জবাবদিহিতার অনুভুতি তাদের নৈতিক শক্তির ভিত্তি।

ওষুধ হিসেবেও মাদক সেবন ইসলামে নিষিদ্ধ। আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: ‘মাদক ওষুধ নয় বরং এটা নিজেই রোগ।’ মাদকের ক্ষতির প্রভাব উপলব্ধি করে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাদক বিনষ্ট করে দেয়ার এবং পাত্রগুলো ভেঙ্গে ফেলার হুকুম দেন। তিনি মাদক ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণারও নির্দেশ প্রদান করেন, যদি তারা সৎপথে ফিরে না আসে। ইসলামী পরিভাষায় চেতনা বিলুপ্তকারী যে কোন মাদকদ্রব্যকে ‘খামর’ বলা হয় এবং এটা ব্যবহার করা হারাম। পবিত্র কুরআনে এ সম্পর্কে বলা হয়েছে- ‘(হে রাসূল!) তারা আপনাকে মদ ও জুয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। বলে দিন, উভয়ের মধ্যে রয়েছে মহাপাপ। আর মানুষের জন্য উপকারিতাও রয়েছে, তবে এগুলোর পাপ উপকারিতা অপেক্ষা অনেক বড়। (সূরা বাকারাহ : ২১৯)

‘হে ঈমাদারগণ! নিশ্চয় মদ, জুয়া, প্রতিমা এবং ভাগ্য নির্ধারক শরগুলো শয়তানের ঘৃণ্যতম কার্যের অন্তর্ভুক্ত। অতএব এগুলো থেকে বিরত থাকো, যাতে তোমরা কল্যাণপ্রাপ্ত হও। শয়তান তো চায় মদ ও জুয়ার মাধ্যমে তোমাদের পরস্পরের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ সঞ্চারিত করতে এবং আল্লাহর স্মরণ ও নামায থেকে বিরত রাখতে। অতএব তোমরা কি এটা থেকে নিবৃত্ত হবে না।’ (সূরা আল-মায়েদা : ৯০-৯১)

পবিত্র কুরআনের নির্দেশনা প্রাপ্তির পর মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সমাজকে মাদকের করালগ্রাস থেকে মুক্ত করার জন্য ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। তিনি সম্যক উপলব্ধি করেন যে, মাদকের ব্যপ্তি অবারিত থাকলে সামাজিক শক্তির অপচয় ও মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটবে; দেখা দিতে পারে নানা জটিল ও ব্যাধি। তিনি বলেন- ‘প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই মদ এবং প্রত্যেক নেশা সৃষ্টিকারী বস্তুই হারাম। যে ব্যক্তি দুনিয়াতে বরাবরই মদ পান করেছে এবং তওবা না করে মৃত্যুবরণ করেছে, সে স্বর্গীয় পানীয় থেকে বঞ্চিত থাকবে।’ (মিশকাতুল মাসবীহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩২৯)

তিনি আরো বলেন: ‘তিন শ্রেণীর লোক জান্নাতে প্রবেশ করবে না- নিত্য মাদকসেবী, আত্মীয়-স্বজনদের সঙ্গে সম্পর্ক বিচ্ছিন্নকারী এবং যাদু-টোনার প্রতি বিশ্বাস স্থাপনকারী।’ (মিশকাতুল মাসাবীহ, ২য় খণ্ড, পৃষ্ঠা- ৩৩৩)

ইসলামে মাদক উৎপাদন, গ্রহণ, বিপণন, আমদানি ও রফতানি কেবল নিষিদ্ধ করা হয়নি বরং এর সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শাস্তিরও ব্যবস্থা করা হয়েছে। মহানবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের শাসনামলে মাদকসেবীদের ৪০টি বেত্রাঘাত করা হত। পরে মাদকের ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে দণ্ডবিধি আরও কঠোর করা হয়। হযরত আবু বকর (রাযি.) ও হযরত উমর (রাযি.)-এর শাসনামলে মাদকসেবীদের ৮০টি বেত্রাঘাত করা হত। এটার ওপর ঐকমত্য (ইজমায়ে উম্মত) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে জনগোষ্ঠীর মধ্যে অবৈধ যৌনাচার ও মাদক সেবনের প্রবণতা বৃদ্ধি পাবে, পৃথিবী ধ্বংস (কিয়ামত) হতে আর বেশিদিন সময় লাগবে না।’ সুতরাং ধর্মীয় অনুশাসন মেনে নেশাজাতীয় দ্রব্য গ্রহণ থেকে বিরত থাকা এইআইভি/ এইড্স সংক্রমণ প্রতিরোধে সবচেয়ে উত্তম পন্থা।

সুস্থ সমাজের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার স্বার্থে মাদকের ভয়াবহতা থেকে যুবসমাজকে বাঁচাতে হবে। মাদকের নেশা থেকে বিরত রাখার কার্যকর উপায় হচ্ছে ধর্মীয় ও নৈতিক মূল্যবোধের জাগরণ, ব্যাপক সচেতনতা সৃষ্টি, মাদক উৎপাদন, বিপণন, আমদানি, চোরাচালান ও সেবনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ ও সর্বাত্মক অভিযান পরিচালনা অত্যন্ত জরুরি।

লেখক : অধ্যাপক ও সাবেক চেয়ারম্যান ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ, ওমরগণি এম ই এস ডিগ্রি কলেজ, চট্টগ্রাম; সম্পাদক, মাসিক আত-তাওহীদ, চট্টগ্রাম

LEAVE A REPLY