হালাল রুজি অন্বেষণের ফযীলত

0
655
হাদীস গ্রন্থ থেকে সঙ্কলিত
সঙ্কলনে : আবু তাহসীন

হযরত নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন :

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাআলা পবিত্র। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা সর্বগুণসম্পন্ন এবং সর্ব প্রকার দোষ-ত্রুটি থেকে মুক্ত। তিনি পবিত্র জিনিস ছাড়া কবুল করেন না।’

কোন কোন আলেম বলেছেন, হারাম মাল দান করে সওয়াবের আশা করা কুফরী। নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ মুমিন বান্দাদেরকে সেই বিষয়ের আদেশ করেছেন, যার আদেশ নবীদেরকে করেছেন। মহান আল্লাহ কালামে পাকে ইরশাদ করেন ‘হে নবীগণ! পবিত্র বস্তু অর্থাৎ হালাল খাবার আহার করুন এবং নেক আমল করুন।’ আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেছেন ‘হে মুমিনগণ! আমি তোমাদেরকে যে পবিত্র বস্তু দান করেছি তা থেকে আহার করো।’ অতঃপর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কতক লোকের কথা বলেছেন, যে লোক (হজ্জ পালন করতে, জ্ঞান অর্জন করার জন্য এবং অন্যান্য নেক আমলের জন্য দূর দেশে ভ্রমণ করে এ অবস্থায় যে, সফরের কষ্টে এলোমেলো কেশে ধূলি ধূসরিত অবস্থায় আকাশের দিকে হাত তুলে এবং) বলে ‘হে আমার প্রতিপালক! হে আমার পরওয়ারদিগার! দয়া করে উদ্দেশ্য সফল করো অথচ তার আহার হারাম, পানীয় হারাম, তার পরিধেয় বস্তু হারাম।’ অর্থাৎ খাদ্য, পানীয় এবং বস্তু হারাম উপার্জন থেকে প্রতিপালিত হয়েছে। সুতরাং কিভাবে (সেই দুআ) কবুল করা হবে? (মুসলিম শরীফ)

অর্থাৎ এত কষ্ট করা সত্ত্বেও হারাম মালের কারণে দুআ কবুল হবে না। যদি কখনো উদ্দেশ্য সাধন হয়েও যায় তাহলে তা দুআর জন্য নয়। দুআ কবুল হওয়ার শর্ত হল, মহান আল্লাহ বান্দার ওপর রহমতের দৃষ্টি দান করেন এবং ওই রহমতের উসিলায় তাকে তার কাক্সিক্ষত বস্তু দান করেন এবং ওই কাক্সিক্ষত বস্তুর ওপর সওয়াব দান করেন। অতএব তা ওই ব্যক্তিই পায়, যে শরীয়তের সীমায় থেকে মহান আল্লাহর দরবারে কাক্সিক্ষত বস্তু কামনা করে। এর দ্বারা জানা গেল, হালাল খাবারে অত্যন্ত বরকত আছে এবং বাস্তবেই তার একটা বিশেষ প্রতিক্রিয়া আছে। এমন খাবার খেলে নেক কাজ করার শক্তি অর্জিত হয়; অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ জ্ঞান-বিবেকের তাবেদারী করে। (মেশকাত শরীফ, লুমআত)

সায়্যিদুনা আবু হামেদ মুহাম্মাদ গাযালী (রহ.) ছিলেন অনেক বড় মাপের একজন বুযুর্গ ও দরবেশ ব্যক্তিত্ব- হযরত সুহাইল (রহ.) থেকে বর্ণনা করেছেন, যে হারাম ভক্ষণ করে, দৈহিক অঙ্গ-প্রত্যক্ষ তাকে মান্য করা ছেড়ে দেয়, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ তার বিরোধিতা করে, আদেশ পালন করে না। কিন্তু এ বিষয়টি কেবল ওই সব বুযুর্গরা বুঝতে সক্ষম হয়েছেন, যাদের হৃদয়চক্ষু দীপ্তিমান, আলোকিত। যাদের হৃদয় কলুষিত ও কালিমাযুক্ত তারা দিন-রাত্রি ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে, তাদের নেক কাজের প্রতি বিন্দুমাত্র আগ্রহ সৃষ্টি হয় না। আল্লাহ মানুষের হৃদয়ের অনুভূতি এবং অন্তরের দৃষ্টিশক্তি এবং জ্ঞান-বিবেককে জাগ্রত রাখুন। আমীন!

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মুবারক (রহ.) বলেন, আমার মতে সন্দেহযুক্ত সম্পদের এক দিরহাম ফিরিয়ে দেয়া ছয় লক্ষ টাকা খয়রাত করা অপেক্ষা অধিক পছন্দনীয় ও উত্তম। এর দ্বারা বুঝে নেয়া উচিত যে, সন্দেহযুক্ত মালের কি জঘন্য পরিণামফল? দুঃখের বিষয়, অনেক মানুষ স্পষ্ট হারামকেও বর্জন করে না; বরং সম্পদ বৃদ্ধিই থাকে তাদের কাম্য। অথচ বুযুর্গানে দ্বীন সন্দেহযুক্ত সম্পদকে কতই না মন্দ মনে করতেন! কাজেই প্রত্যেক ব্যক্তিরই হারাম মাল থেকে বেঁচে থাকা অত্যবশ্যক। এ ক্ষেত্রে অত্যন্ত সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত। হারাম সম্পদ দ্বারা আহার করলে অসংখ্য দোষত্রুটি নফসের ভেতর প্রবেশ করে, এটা মানুষের চরম ধ্বংস ডেকে আনে।

আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

হালাল যেমন স্পষ্ট তেমনি হারামও স্পষ্ট। উভয়ের মাঝে সন্দেহযুক্ত বিষয় বিদ্যমান আছে, যা অধিকাংশ মানুষের জানা নেই। এমন লোকেরা সংখ্যা অল্পই যারা তা জানেন। (তারা অতি বড় মুত্তাকী আলেম, যারা স্বীয় জ্ঞান অনুযায়ী উত্তমরূপে আমল করেন।) সুতরাং যে পরহেযগারী অবলম্বন করল, সে সন্দেহযুক্ত বস্তু থেকে স্বীয় দ্বীনকে বাঁচিয়ে রাখল। অর্থাৎ জাহান্নামের শাস্তি থেকে নাজাত পেল এবং মন-সম্মানকে বাঁচিয়ে রাখল। কুৎসা রটনাকারীদের থেকে স্বীয় সম্মান রক্ষা করল। কেননা শরীয়ত বিরোধীদেরকে লোকেরা দোষারোপ করে, গালমন্দ করে, একথা সবারই জানা যে, দ্বীন-দুনিয়ার লাঞ্ছনা থেকে বেঁচে থাকা সব বুদ্ধিমানেরই উচিত। যে সন্দেহযুক্ত বস্তুগুলোতে পতিত হবে, সে হারামে নিপতিত হবে। অর্থাৎ যে ব্যক্তি সন্দেহের বস্তু থেকে বেঁচে থাকে না, সে ধীরে ধীরে হারাম কাজে লিপ্ত হয়ে পড়ে। যেখানেই নফসকে একটু অবকাশ দেয়া গেল, সেখানেই সে ধীরে ধীরে এমন ভয়াবহ কাজ করে যে, তা তাকে ধ্বংসই করে দেয়। কারণ হারাম উপায়ে অর্জনকৃত সম্পদ মানুষকে একেবারেই নষ্ট করে ফেলে।

সুতরাং যে লোক ধন-সম্পদের বিষয়ে সাবধানতা অবলম্বন করে না, যা পায় তাই গ্রহণ করে, কোন সন্দেহযুক্ত মালের ব্যাপারে ভ্রক্ষেপও করে না, সে অতি শীঘ্রই হারাম খেতে অভ্যস্ত হয়ে পড়বে। কাজেই নফসকে সর্বদা শরীয়তের বন্ধনে আবদ্ধ করে রাখবে, কখনো স্বাধীনতা দেবে না। এমন সন্দেহযুক্ত মাল যার কোন সঠিক অবস্থা জানা নেই যে, তাতে কতটুকু হালাল আছে, আর কতটুকু হারাম, তা খাওয়া যদিও জায়েয আছে, তবে তা মাকরূহ কিন্তু এমন সন্দেহপূর্ণ বিষয় থেকেও বেঁচে থাকা জরুরি। কেননা আসল উদ্দেশ্য এবং সাহসের কথা তো এটাই।

রাখালের কথা ভালোভাবে বুঝে নাও, যে রাখাল সেই চারণভূমির আশেপাশে পশু চরায়, যা বাদশাহ নিজের গবাদি পশুর জন্য নির্ধারিত করে রেখেছেন। সম্ভাবনা আছে, হয়ত সেই ‘নিষিদ্ধ’ মাঠে চরিয়ে বসবে। অর্থাৎ যে রাখাল এমন নিষিদ্ধ চারণভূমির আশেপাশে পশু চরায় সে হয়ত শীঘ্র নিষিদ্ধ চারণভূমিতে পশু চরাতে থাকবে। কেননা এভাবে চরানো অবস্থায় যে পশুগুলো সীমা অতিক্রম করবে না বা স্বয়ং রাখালই হয়ত এ দুঃসাহস থেকে মোটেও সাবধানতা অবলম্বন করবে না, তা বলা অসম্ভব। এভাবে নফসেরও সতর্কতা থাকে না, কখনো বা শুরুতেই সন্দেহের স্থলে পৌঁছতে না পৌঁছতেই হারামে লিপ্ত হয়ে পড়ে অথবা কিছুদিন পর এ অবস্থায় নিপতিত হয়ে যাবে।

মনে রাখতে হবে, যে ঘাস পরিশ্রম ছাড়া নিজে নিজেই উৎপন্ন হয় এমন ঘাসের মাঠকে নিজের জন্য নির্দিষ্ট করে নেয়া এবং অন্যদেরকে চরাতে বারণ করা ভূমির মালিকের জন্য জায়েয নয়। এখানে কেবল উপমা পেশ করাই উদ্দেশ্য ছিল।

সাবধান! প্রত্যেক বাদশাহর একটি চারণভূমি আছে এবং সাবধান! আল্লাহর চারণভূমি তার হারামসমূহ। যে ব্যক্তি ওই হারামে পতিত হবে, সে আল্লাহ খেয়ানত করবে। একথা পরিষ্কার যে, বাদশাহর সাথে খেয়ানত করা হল রাষ্ট্রদ্রোহিতা। মহান আল্লাহ যেহেতু বাদশাহদের বাদশাহ। সুতরাং তাঁর খেয়ানত উচ্চস্তরের রাষ্ট্রদ্রোহিতা, যার শাস্তিও অতি বড়। জেনে রেখ, মানুষের দেহে এমন একটা মাংসপি- আছে, তা যখন সুস্থ থাকবে অর্থাৎ তাতে অভ্যন্তরীণ বা বাহ্যিক দোষ না থাকবে, তখন দেহ সুস্থ থাকবে। যখন তা খারাপ হবে, তখন সব শরীরও খারাপ হবে। জেনে রেখ, মাংসপি- হল অন্তর। অন্তর সুস্থ থাকলে শরীর পুরোটাই সুস্থ থাকে। সুস্থ অন্তর মহান আল্লাহর ইবাদতে নিমগ্ন থাকে। গোনাহ করলে দিল অন্ধকার হয়ে যায়। মূলকথা আত্মার সুস্থতা ছাড়া নেক আমল সম্ভব নয়। হালাল খাওয়া অন্তরের পরিচ্ছন্নতার সাথে সম্পৃক্ত। এ হাদীস দ্বারা হালাল খাওয়ার প্রতি গুরুত্ব দেয়ার জন্য উৎসাহ দেয়া হয়েছে। (মেশকাত শরীফ, বুখারী, মুসলিম)

নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

‘মহান আল্লাহ ইহুদীদেরকে ধ্বংস করুন। তাদের প্রতি চর্বি হারাম করা হয়েছিল। তখন তারা সেটাকে গলিয়ে তরল করল এবং তা বিক্রি করল।’ (সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম)

অর্থাৎ তারা হুবহু চর্বি খেল না; বরং তার মূল্য খেল। তারা মনে করল, এটা চর্বি খাওয়া নয় অথচ ওই মূল্য খাওয়াও হারামের অন্তর্ভুক্ত ছিল। বর্তমানে কিছু সুদখোর এ ধরনের বাহানা সৃষ্টি করে নিয়েছে, যেন বাহ্যিক দৃষ্টিতে সুদ থেকে বেঁচে যায় এবং অবাধে সুদ খেতে পারে। কিন্তু মহান আল্লাহ গায়েব সম্পর্কে সম্যক অবগত, তিনি মনের অবস্থা ভালোভাবেই জানেন। কোনক্রমেই এমন অজুহাত গ্রহণযোগ্য নয়। (মেশকাত শরীফ)

LEAVE A REPLY